• সাভার

  •  শনিবার, মে ১৮, ২০২৪

নগর জুড়ে

ঘিওরে দরিদ্রদের ঈদের আনন্দ আনে ৩০০ ‘মাংস সমিতি’

নিজস্ব প্রতিবেদক

 প্রকাশিত: ১০:১২, ১৯ এপ্রিল ২০২৩

ঘিওরে দরিদ্রদের ঈদের আনন্দ আনে ৩০০ ‘মাংস সমিতি’

ঘিওরে দরিদ্রদের ঈদের আনন্দ আনে ৩০০ ‘মাংস সমিতি’

মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় গড়ে উঠেছে এক ধরনের ব্যতিক্রমী সমিতি। মাসে মাসে সঞ্চয় করে বছর শেষে ঈদুল ফিতরের আগে পশু কিনে জবাই করে মাংস ভাগ করে নেন সমিতির সদস্যরা। এতে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষের আর্থিক চাপ যেমন একদিকে কমে, তেমনি ঈদের আগে পরিবারের সদস্যদের মুখে তুলে দিতে পারেন গোশত। এসব সমিতি ‘মাংস সমিতি’ নামেই পরিচিত।

সারা দিন মুদিদোকান করে ৭ সদস্যের ঘানি টানেন সিংজুরী গ্রামের আলাল মিয়া। সঙ্গে দুই সন্তানের লেখাপড়ার খরচ; রয়েছে এনজিওর কিস্তি; নুন আনতে পান্তা ফুরায় অবস্থা। তবুও আসে ঈদ। কষ্ট হলেও সবার কাপড়চোপড় আর তেল-সেমাই-চিনি কিনতেই হয়। তার মধ্যে ছেলেমেয়েরা যখন ঈদের দিন মাংস খাওয়ার বায়না ধরে, অসচ্ছল বাবার সাধ্যে তখন আর কুলায় না।

গত ঈদুল ফিতরে সন্তানদের মাংসের বায়না পূরণ করতে পারেননি। এবার এলাকায় গোশত সমিতির সদস্য হয়েছেন তিনি। মাসে ৩০০ টাকা করে সমিতিতে দিয়েছেন চাঁদা। গতকাল মঙ্গলবার গরু কেনা হয়েছে। জবাই করে মাংস ভাগাভাগি করে নিয়েছেন সমিতির ৪০ জন সদস্য। এবার তাঁর সন্তানদের বায়না পূরণ হবে। সেটা ভাবতেই ভালো লাগছে আলালের।

তিনি বলেন, ‘সব জিনিসপত্রের দাম বেশি, মাংস কেনা আমার মতো দরিদ্র মানুষের কষ্টকর। একসঙ্গে পাঁচ কেজি মাংস পেয়ে আমার সন্তানদের মুখে হাসি ফুটেছে।’ শুধু আলাল নন, উপজেলার বালিয়াখোড়া, সিংজুরী, বানিয়াজুরী, নালি, বড়টিয়া, পয়লা ও ঘিওর সদরসহ বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে এ ধরনের সমিতি। প্রতিবছর বাড়ছে সমিতি ও সদস্য সংখ্যা। এ বছর ঘিওরের ৭টি ইউনিয়নের ১৮৫টি গ্রামে রয়েছে তিন শতাধিক মাংস সমিতি। ঈদুল ফিতরের ঈদকে ঘিরে এই ‘গোশত সমিতি’ এখন ব্যাপক সাড়া পেয়েছে। ইতিমধ্যে অনেক সমিতির সদস্যরা গরু, মহিষ কিনে মাংস ভাগাভাগি করে নিয়েছেন।

গতকাল মঙ্গলবার একাধিক সমিতির সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বছর ছয়-সাত আগে উপজেলায় হাতে গোনা কয়েকটি এলাকায় এ ধরনের সমিতি চালু হয়। এরপর সমিতির সংখ্যা বাড়তে থাকে। দিনমজুর, গার্মেন্টস শ্রমিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীসহ গাঁয়ের গৃহবধূরা তৈরি করেন এমন সমিতি। সাধারণত সদস্য থাকে ২০ থেকে ৬০ জন। থাকেন একজন সভাপতি ও একজন কোষাধ্যক্ষ।

প্রতি মাসে নির্ধারিত হারে চাঁদা জমা দেন। পরে জমা করা টাকায় ঈদের এক সপ্তাহ আগে থেকে গরু, মহিষ বা ছাগল কিনে এনে জবাই করে মাংস ভাগ করে নেন তাঁরা। শুরুতে শুধু নিম্নবিত্তের লোকেরা এ ধরনের সমিতি করলেও এখন মধ্যবিত্ত ও উচ্চ মধ্যবিত্তের সংখ্যাও অনেক। নারীদের অংশগ্রহণ সবচেয়ে বেশি।

বানিয়াজুরী ইউনিয়নে ১৬টি সমিতি রয়েছে। এ ইউনিয়নের রাথুরা গ্রামের ৩৬ জন গৃহবধূদের গোশত সমিতি ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা দিয়ে গরু কিনে মাংস ভাগ করে নিয়েছেন। মঙ্গলবার বিকেলে সরেজমিনে দেখা যায়, সব সদস্য খুশি মনে সুশৃঙ্খলভাবে গোশত ভাগ করে বিলি করছেন। সমিতির সভাপতি মর্জিনা বেগম বলেন, গত বছর সমিতিতে সদস্য সংখ্যা ছিল ২৫। এবার ৩৬ সদস্য, চাঁদা মাসে জনপ্রতি ৩০০ টাকা করে। একটি গরু কিনে এনে সমিতির সদস্যদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। প্রত্যেকের ভাগে ৫ কেজি করে মাংস পড়েছে। সঞ্চয়ের টাকায় একসঙ্গে এতখানি মাংস পেয়ে খুশি।

ব্যালট গ্রামের শারীরিক প্রতিবন্ধী আক্কাছ আলী বলেন, ‘ঈদের আগে নানা কিছু কেনাকাটায় টাকা শেষ হয়ে যায়। এ সময় তাঁদের মতো নিম্ন আয়ের মানুষের পক্ষে গরুর মাংস কেনা অসম্ভব হয়ে পড়ে। সমিতি করে ৬ কেজি মাংস পেয়েছি। ঈদের আনন্দ বেড়ে গেছে।’

পয়লা ইউনিয়নের চর বাইলজুরী গ্রামের এক সমিতির সভাপতি মামুন বলেন, ‘সমিতিতে সদস্যসংখ্যা ৫০ । মাসিক চাঁদা ৫০০ টাকা। এই টাকা দিয়ে ১টি গরু ও ১টি মহিষ কিনেছি। আগামী বৃহস্পতিবার সদস্যদের মধ্যে মাংস ভাগ করে দেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, তাঁদের ইউনিয়নে এমন অন্তত ২০টির মতো সমিতি আছে।

বানিয়াজুরী ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান এস আর আনসারি বিল্টু বলেন, ‘এলাকায় গোশত সমিতি ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। দিন দিন এ সমিতির সংখ্যা বাড়ছে। সারা বছর একটু একটু সঞ্চয় করে ঈদের আগে পশু কিনে জবাই করে মাংস ভাগ করে নেওয়ার মধ্যে তাঁরা বাড়তি আনন্দ পেয়ে থাকেন। এতে সংসারের চাপও অনেক কমে যায়।’

মন্তব্য করুন: